অর্থনীতি
ব্যাংকক বৈঠকে বিশ্ব অর্থনীতির নতুন সমীকরণ
রাকিবুল হাসান শান্তঃ আন্তর্জাতিক অর্থনীতির গতি, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার অর্থনৈতিক প্রভাব, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার এবং বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মধ্য দিয়ে আগামী ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বিশ্বের অন্যতম বড় এই অর্থনৈতিক আয়োজন। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা এবার এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৯৯১ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো থাইল্যান্ড এই সভার আয়োজক হচ্ছে। কুইন সিরিকিট ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিতব্য সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, উন্নয়ন নীতিনির্ধারক, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, গবেষক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। এবারের বৈঠক এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি একদিকে নানা অভিঘাত সামলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়নি। আইএমএফের জুলাই ২০২৬-এর বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বৈশ্বিক অর্থনীতি ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সব অঞ্চলে সমান হবে না। যুদ্ধের অভিঘাত জ্বালানি আমদানিনির্ভর ও ঝুঁকিপূর্ণ অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে, বিপরীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকেন্দ্রিক প্রযুক্তি বিনিয়োগ কিছু অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দিচ্ছে। প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও এবারের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আইএমএফ বলছে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে চলা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে থমকে গেছে। জুলাইয়ের পূর্বাভাসে ২০২৬ সালের বৈশ্বিক সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার বিষয়টি নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, পণ্যবাজার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হলে তা বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশও পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে ব্যাংককের বৈঠকে বৈশ্বিক অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোর নীতি সমন্বয়, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইএমএফের এবারের সামগ্রিক মূল্যায়নে প্রযুক্তির ভূমিকা বিশেষভাবে উঠে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতির কিছু অংশে চাহিদা বাড়াচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুফল সব দেশের মধ্যে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়বে কি না, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যেসব দেশ প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে, তাদের জন্য নতুন প্রযুক্তির অর্থনৈতিক সুবিধা কাজে লাগানো তুলনামূলক কঠিন হতে পারে। ব্যাংককের সভায় ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে Annual Meetings Plenary। এতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এবং প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কার্লোস কারভালো স্পালডিং বক্তব্য দেবেন। ১৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে International Monetary and Financial Committee বা আইএমএফসির পূর্ণাঙ্গ বৈঠক। এবারের সভার আলোচনায় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানও গুরুত্ব পাবে। বিশ্বব্যাংকের কর্মসূচিতে ১২ অক্টোবর ‘Small AI, Big Jobs’ এবং ১৪ অক্টোবর ‘Mobilizing Private Capital for Jobs’ নামে দুটি বিশেষ আয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে সম্পর্ককে বৈশ্বিক উন্নয়ন আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈঠকটির গুরুত্ব আরও বেশি। বৈশ্বিক সুদের হার, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম এবং উন্নয়ন অর্থায়নের পরিবর্তন এসব দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে উচ্চ ঋণ ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার কারণে অনেক দেশকে প্রবৃদ্ধি, সামাজিক ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংককের বার্ষিক সভা শুধু বৈশ্বিক অর্থনীতির বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনার জায়গা নয়, বরং আগামী দিনের নীতি নির্ধারণের…
ব্যাংককে এশিয়ার অর্থনীতির দিকে বিশেষ নজর
মো মহসিনঃ এশিয়ার পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ধারা, প্রযুক্তিনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায়। আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হবে এই সভা। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও থাইল্যান্ডে বসছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা। ১৯৯১ সালে প্রথমবার ব্যাংককে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারের আয়োজনে এশিয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশেষভাবে সামনে আসছে। আইএমএফ বলছে, ব্যাংকককে দ্বিতীয়বারের মতো সভার আয়োজক করা এশিয়ার বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতায় ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টিও তুলে ধরে। এশিয়ার অর্থনীতির জন্য বর্তমান সময়টি একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের। অঞ্চলটির অনেক দেশ বৈশ্বিক উৎপাদন, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নতুন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি করছে। অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যিক বাধা এবং বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন এশিয়ার রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর সামনে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। আইএমএফের জুলাইয়ের বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে ৩ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। তবে প্রবৃদ্ধির ধরন বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন হবে। প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের কারণে কিছু অর্থনীতি বাড়তি সুবিধা পেলেও যুদ্ধের অভিঘাত জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তাদের অবস্থান। দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ার অনেক অর্থনীতি উৎপাদন ও রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে এসেছে। পোশাক, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রপাতি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্যের বৈশ্বিক বাজারে এশিয়ার দেশগুলোর বড় অংশীদারত্ব রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন বা সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্থনীতির বড় একটি অংশ বৈদেশিক বাণিজ্য, রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় ও আমদানির সঙ্গে যুক্ত। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, জ্বালানি মূল্য এবং বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের এবারের কর্মসূচিতে কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ১৪ অক্টোবর ‘Mobilizing Private Capital for Jobs’ শীর্ষক একটি আয়োজন রয়েছে। এর মাধ্যমে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নের সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হবে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য কর্মসংস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন। তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করা, দক্ষতা বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে শ্রমবাজারকে মানিয়ে নেওয়া আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতির বড় অংশ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এ ক্ষেত্রে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি প্রচলিত কাজের ধরন পরিবর্তনের সম্ভাবনাও তৈরি করছে। বিশ্বব্যাংকের ‘Small AI, Big Jobs’ আয়োজনেও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ছোট পরিসরের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবসা, দক্ষতা, অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশ এবং জনসেবায় ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়টি সামনে রাখা হয়েছে। এই আলোচনায় বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম অংশ নেবেন। এশিয়ার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে—উৎপাদনশীলতা। শুধু কম শ্রম ব্যয়ে উৎপাদন নয়, প্রযুক্তি, দক্ষতা, অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের ভূমিকা রয়েছে। ব্যাংককের সভায় অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এবং অন্যান্য নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন। ফলে এশিয়ার অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা শুধু সরকারি নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বিনিয়োগ, ব্যবসা, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অর্থায়নের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিভিন্ন বিষয় উঠে আসবে। এবারের আয়োজন তাই এশিয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সমাবেশ। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবর্তিত…